বিটিএ’র জন্মশত বার্ষিকীর উদ্বোধন

১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের সর্বপ্রাচীন ও সর্ববৃহৎ শিক্ষক সংগঠন ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বিটিএ)’র উদ্যোগে ৬ ফেব্রæয়ারি ২০২১ শনিবার সকাল ১০:৩০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মনোজ্ঞ শোভাযাত্রা এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের “মাওলানা আকরাম খাঁ হল” এ সম্পূর্ণ স্বাস্থবিধি মেনে “১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষক সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বিটিএ) এর জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষ্যে সমিতির সভাপতি অধ্যক্ষ মোঃ বজলুর রহমান মিয়া’র সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ শেখ কাওছার আহমেদ এর সঞ্চালনায় এক মনোজ্ঞ শোভাযাত্রা ও কেক কাটার মাধ্যমে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামাল প্রধান অতিথি এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কবি, লেখক, নাট্যকার, কিশোর আলো সম্পাদক এবং দৈনিক প্রথম আলোা সহযোগী সম্পাক জনাব আনিসুল হক, সমিতির অন্যতম উপদেষ্টা ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য বাবু রঞ্জিত কুমার সাহা এবং সমিতির সিনিয়র সহ সভাপতি অধ্যক্ষ মোঃ আবুল কাশেম। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সমিতির সহ সভাপতি আলী আসগর হাওলাদার, বেগম নূরুন্নাহার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আবু জামিল মোঃ সেলিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ ইকবাল হোসেন, সহ সাংস্কৃতিক সম্পাদক ফাহমিদা রহমান, সহ মহিলা বিষয়ক সম্পাদক শাহানা বেগম, অন্যান্য শিক্ষক সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ প্রমুখ শিক্ষক-কর্মচারী নেতৃবৃন্দ। বিটিএ’র জন্মশত বার্ষিকীতে অভিনন্দন জানিয়েছেন বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস), বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি (বাকশিস), বাংলাদেশ জমিয়তুল মোদারেসীন, বাংলাদেশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্মচারী সমিতিসহ প্রমুখ শিক্ষক-কর্মচারী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। কেন্দ্র ছাড়াও বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বিটিএ) একযোগে সারাদেশের উপজেলা/থানা, জেলা/মহানগর, অঞ্চলিক শাখাসমূহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্য জন্মশত বার্ষিকীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পালন করেন।

সকাল ১০:৩০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে শিক্ষকদের মনোজ্ঞ শোভাযাত্রা এবং ১১:৩০টায় আলোচনা সভা ও কেক কেটে ঐতিহ্য ও গৌরবের জন্মশত বার্ষিকী উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নেতৃবৃন্দ সমিতির শতবর্ষের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। ১৯২১ সালের ৬ ফেব্রæয়ারি রংপুর জেলার গাইবান্ধা মহকুমার গাইবান্ধা ইসলামিয়া হাই স্কুলে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় -এর সভাপতিত্বে আনুষ্ঠানিক শিক্ষক সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত হয় “অল বেঙ্গল টিচার্স এসোসিয়েশন (এবিটিএ)”। সভাপতি নির্বাচিত হন রায় সাহেব ঈশান চন্দ্র ঘোষ এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত। এরপর অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ১৯৪৭ এর পর সঙ্গত কারণে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় “ইস্ট বেঙ্গল টিচার্স এসোসিয়েশন (ইবিটিএ)” এবং পরবর্তীতে “ইস্ট পাকিস্তান টিচার্স এসোসিয়েশন (ইপিটিএ)” সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সুলতান মাহমুদ ও মীর আব্দুল গফুর। ১৯৬৫ সালে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন যথাক্রমে অধ্যক্ষ মোঃ কারুজ্জামান ও আব্দুল মান্নান। এরপর ১৯৬৮ সালে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন মোঃ মোখলেসুর রহমান ও অধ্যক্ষ মোঃ কামরুজ্জামান। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭১ সালে সমিতির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় “বাংলাদেশ টিচার্স এসোসিয়েশন (বিটিএ)” যার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন অধ্যক্ষ মোঃ কামরুজ্জামান ও মোঃ জয়নুল আবেদীন। ১৯৭৪ ও ১৯৭৬ পর পর দুই মেয়াদেই যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন অধ্যক্ষ মোঃ কামরুজ্জামান ও চৌধুরী খুরশীদ আলম এবং ১৯৭৯, ১৯৮৬ ও ১৯৮৯ তিন মেয়াদেই একাধারে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন অধ্যক্ষ মোঃ কামরুজ্জামান ও মিসেস হেনা দাস। একইভাবে ১৯৯২, ১৯৯৫ ও ১৯৯৯ ধারাবাহিকতা রক্ষা করে তিন মেয়াদেই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন অধ্যক্ষ মোঃ কামরুজ্জামান ও চৌধুরী খুরশীদ আলম। ২০০৩ সালে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন অধ্যক্ষ এম. এ. আউয়াল সিদ্দিকী ও মোঃ আবু বকর সিদ্দিক। ২০১০ সালে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন কে এম আবুল হাসান ও রঞ্জিত কুমার সাহা। পরিতাপের বিষয় ২০১১ সালে সভাপতি কে এম আবুল হাসান মৃত্যুবরণ করায় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন মোঃ হাবিবুর রহমান এবং আতিয়ার রহমান। একই মেয়াদে আতিয়ার রহমানের আকস্মিক মৃত্যুর পর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন আলী আহমেদ। ২০১৪ সালে সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন যথাক্রমে আলহাজ্জ্ব মুহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক ও অধ্যক্ষ মোঃ আবুল কাশেম এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন অধ্যক্ষ মোঃ বজলুর রহমান মিয়া ও অধ্যক্ষ শেখ কাওছার আহমেদ।

১৯২১ সাল থেকে শিক্ষা ও শিক্ষক-কর্মচারীদের অধিকার আদায়ে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বিটিএ)’র রয়েছে গৌরবোজ্জল ভ‚মিকা। ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ষাটের দশকের শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ সহ দেশের ক্রান্তিকালে এ সংগঠনটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে আসছেন। শিক্ষার মানোন্নয়নসহ শিক্ষক-কর্মচারীদের অধিকার আদায়ে সংগঠনটি একশত বছর ধরে নিবেদিতভাবে অবদান রেখে চলেছেন। এযাবৎকাল উপজেলা থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সভা, সমাবেশ, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, প্রতীকি অনশন, অবস্থান ধর্মঘট, প্রতীকি কর্মবিরতি, কলম বিরতি, অবস্থান ধর্মঘট ও মহাসমাবেশের মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারীদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার ছিল, এখন আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকার জন্য দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রত্যাশার তুলনায় প্রাপ্তি অনেক কম একথা অনস্বীকার্য। তবে এযাবৎকাল বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয় বেতন স্কেলের অন্তর্ভ‚ক্তিকরণ, বিভিন্ন সময়ে বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, পেস্কেলভ‚ক্তকরণ, বৈশাখী ভাতা ও ৫% বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট আদায়ে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বিটিএ) সবসময় অগ্রভাগে থেকে আন্দোলন সংগ্রাম করেছে। তাছাড়া কোনরূপ সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি না করে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে অতিরিক্ত ৪% কর্তনের প্রতিবাদে সমিতি বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের আন্দোলন সর্বপ্রথম বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বিটিএ)ই শুরু করেছিল এবং বিটিএ’র আহবানে সাড়া দিয়েই ২০১৭ সালে শিক্ষক-কর্মচারী সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়েছিল। শিক্ষক-কর্মচারী সংগ্রাম কমিটির ব্যানারে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের এক দফা দাবীতে ২০১৮ সালের ১৪ মার্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এযাৎকালের সর্ববৃহৎ শিক্ষক মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পাশপাশি সেই মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলাপ-আলোচনার একপর্যায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য বৈশাখী ভাতাসহ ৫% বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ঘোষণা করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারি এবং বেসরকারি পাহাড়সম বৈষম্য রয়েছে। সেই বৈষম্য নিরসনের একমাত্র উপায় হলো- “শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ”। শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ তথা মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণের দাবী আদায়ের অঙ্গীকার নিয়েই সারাদেশে বিটিএ “জন্মশত বার্ষিকী” পালন করছে। তাই নেতৃবৃন্দ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সারাদেশের শিক্ষক-কর্মচালেিদর প্রাণের দাবী শিক্ষা ও শিক্ষক বান্ধব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুজবিবর্ষ এবং বিটিএ’র জন্মশত বার্ষিকীতেই মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণের ঘোষণা দেবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *